বাবা মায়ের মর্যাদা কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে

 

বাবা-মায়ের মর্যাদা: কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে

বাবা-মা একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত সম্পর্কগুলোর মধ্যে অন্যতম। একজন সন্তান পৃথিবীতে আসার পর তাকে লালন-পালন করা, ভালোবাসা দেওয়া, শিক্ষা দেওয়া এবং জীবনের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অবদান অপরিসীম। সন্তানের জন্য তারা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন এবং দিনের পর দিন পরিশ্রম করেন। তাই ইসলাম বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সদ্ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পাশাপাশি বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আল-ইসরার ২৩ নম্বর আয়াতে বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে এবং তারা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইসলামে বাবা-মায়ের মর্যাদা

ইসলামের দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তারা সন্তানের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তা কোনো বস্তুগত সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, প্রসবের কষ্ট সহ্য করেন এবং শৈশব থেকে তাকে যত্ন ও ভালোবাসায় বড় করে তোলেন। অন্যদিকে বাবা পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করে সন্তানের খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করেন।

পবিত্র কোরআনের সূরা লুকমানের ১৪ নম্বর আয়াতে মানুষের প্রতি বাবা-মায়ের প্রতি যত্নশীল ও কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশের পাশাপাশি মায়ের গর্ভধারণ ও লালন-পালনের কষ্টের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মায়ের মর্যাদা

ইসলামে মায়ের মর্যাদা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ একজন মা সন্তানকে দীর্ঘ সময় গর্ভে ধারণ করেন, প্রসবের কষ্ট সহ্য করেন এবং জন্মের পরও দিনের পর দিন তার যত্ন নেন। সন্তানের ছোট ছোট প্রয়োজন পূরণ করতে মা নিজের বিশ্রাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভুলে যান।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে একজন সাহাবি জানতে চেয়েছিলেন, তার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে। উত্তরে মায়ের কথা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এরপর আবার জিজ্ঞাসা করা হলে মায়ের কথা বলা হয় এবং পরবর্তী পর্যায়েও মায়ের কথা উল্লেখ করা হয়; এরপর বাবার কথা বলা হয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, সন্তানের ওপর মায়ের অধিকার ও মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাবার মর্যাদা কম। বরং বাবা-মা উভয়ের প্রতিই সম্মান, ভালোবাসা ও সদ্ব্যবহার করা সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বাবার মর্যাদা

একটি পরিবারের দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে একজন বাবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কঠোর পরিশ্রম করেন। অনেক বাবা নিজের প্রয়োজনকে পিছনে রেখে সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করেন।

তাই বাবার প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সন্তানের কর্তব্য। বাবার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলা, তার প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং বার্ধক্যে তার যত্ন নেওয়া একজন সন্তানের নৈতিক ও পারিবারিক দায়িত্বের অংশ।

বাবা-মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত?

বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো আচরণ শুধু বড় কোনো কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণের মধ্যেও তাদের প্রতি সম্মান প্রকাশ করা যায়।

তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর নরম রাখা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনে সাহায্য করা এবং তাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে বাবা-মায়ের সঙ্গে এমনকি বিরক্তি প্রকাশের সামান্য শব্দ ব্যবহার থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব

বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। যেমন—

১. সম্মানের সঙ্গে কথা বলা:
বাবা-মায়ের সঙ্গে কখনো রূঢ় বা অপমানজনক ভাষায় কথা বলা উচিত নয়। মতের পার্থক্য থাকলেও শান্ত ও ভদ্রভাবে নিজের কথা প্রকাশ করা উচিত।

২. সেবা-যত্ন করা:
তারা অসুস্থ, দুর্বল বা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণে যথাসাধ্য সহযোগিতা করা উচিত।

৩. তাদের কষ্ট না দেওয়া:
এমন কোনো কথা বা আচরণ করা উচিত নয়, যার কারণে বাবা-মা অকারণে মানসিকভাবে কষ্ট পান।

৪. তাদের জন্য দোয়া করা:
বাবা-মায়ের জন্য আল্লাহর কাছে রহমত, ক্ষমা ও কল্যাণের দোয়া করা উচিত। কোরআনে বাবা-মায়ের জন্য রহমতের দোয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো:
বাবা-মায়ের জীবনের কঠিন সময়ে তাদের একা ফেলে না দিয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকা উচিত।

৬. বৈধ বিষয়ে তাদের কথা মানা:
বাবা-মায়ের বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত নির্দেশ মেনে চলা সন্তানের দায়িত্ব। তবে কোনো বিষয়ে আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ থাকলে তা মানা যাবে না; একই সঙ্গে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো আচরণ বজায় রাখতে হবে।

বাবা-মা বৃদ্ধ হলে দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের শারীরিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তখন তারা আগের মতো চলাফেরা করতে বা নিজের সব কাজ করতে সক্ষম নাও হতে পারেন। এই সময় তাদের বিরক্তির কারণ হিসেবে না দেখে ধৈর্য ও ভালোবাসার সঙ্গে পাশে থাকা উচিত।

পবিত্র কোরআনে বাবা-মা বার্ধক্যে পৌঁছালে তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলা এবং তাদের প্রতি বিনয়ী ও দয়াশীল হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক সন্তান কাজ, পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে বাবা-মাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। কিন্তু তাদের সঙ্গে কিছু সময় কথা বলা, খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোও তাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের কারণ হতে পারে।

বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা কেন জরুরি?

মানুষ জীবনে অনেক মানুষের কাছ থেকে সাহায্য পায়, কিন্তু বাবা-মায়ের অবদান সাধারণত অন্য যেকোনো সম্পর্কের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর। সন্তানের ছোটবেলার অসহায় সময় থেকে শুরু করে বড় হওয়া পর্যন্ত তারা নানা ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেন।

কোরআনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি বাবা-মায়ের প্রতিও কৃতজ্ঞ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সন্তানের উচিত বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও ত্যাগকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে না দেখে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা।

বাবা-মা মারা গেলে কী করা উচিত?

বাবা-মা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পরও সন্তানের দায়িত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের রেখে যাওয়া বৈধ দায়িত্ব ও সম্পর্কগুলো যথাযথভাবে রক্ষা করা এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখা একজন সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের জীবদ্দশায় যে ভালোবাসা ও যত্ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, তা পরে ফিরে পাওয়া যায় না। তাই বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং তাদের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

বাবা-মা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য একটি বড় নিয়ামত। তাদের ভালোবাসা, ত্যাগ ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য কোনো কিছুর বিনিময়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ইসলামে তাই বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান, সদ্ব্যবহার, সেবা ও কৃতজ্ঞতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আমাদের উচিত শুধু বিশেষ কোনো দিনে নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো আচরণ করা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনে সেবা-যত্ন করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা। বাবা-মা জীবিত থাকলে তাদের ভালোবাসা ও যত্ন নেওয়ার সুযোগকে মূল্য দিতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বাবা-মায়ের হক যথাযথভাবে আদায় করার, তাদের সম্মান করার এবং তাদের জীবদ্দশায় ভালোবাসা ও সেবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
1 জন কমেন্ট করেছেন ইতোমধ্যে
  • Shihab
    Shihab ৭ জুলাই, ২০২৬ এ ৯:৪৫ PM

    💝

মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অজানা নেটওয়ার্কে আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে নিচে কমেন্ট করুন। আপনার প্রতিটি মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ;

comment url